সাওম ও ইতিকাফ

সাওম বা রোযাঃ

সাওম বলতে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করার নিয়তে পূর্ণ একদিন পাকস্থলীর চাহিদা অর্থাৎ পানাহার ও যৌনাঙ্গের চাহিদা থেকে বিরত থাকাকে বুঝায়। হায়িয, নিফাস ও ঈদোৎসবের দিনগুলো ব্যতীত বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে সিয়াম রাখা যায়। রমাদ্বান মাসের ২৯ বা ৩০ দিনের সিয়াম ফারদ্ব। প্রত্যেক সামর্থবানকেই সেটা রাখতে হবে।

সাওমের রুকন তিনটি। যথাঃ

১/ বিরত থাকা। যেসব জিনিস সাওম ভেঙ্গে দেয়, সেসব থেকে বিরত থাকা। যেমনঃ সহবাস করা, স্বেচ্ছায় যেকোন উপায়ে বীর্যপাত করা, কিংবা বমি করা। অন্যগুলো হলো, পানাহার করা, অথবা খাদ্যগ্রহণের ন্যায় মুখ, চোখ, নাক কিংবা কান দিয়ে এমন কিছু গ্রহণ করা যা গলায় পৌঁছে।

২/ নিয়ত। কোন সিয়ামই চাই নফল হোক কিংবা ফারদ্ব হোক নিয়ত ব্যতীত শুদ্ধ হবে না। যেধরনের সিয়াম রাখা হচ্ছে, সেই ধরনের সিয়ামের জন্যে খাস নিয়ত করতে হবে। মিছাল হিসেবে, যদি রমাদ্বানের ফারদ্ব সিয়াম হয়, তবে এটার জন্যে ‘রমাদ্বানের ফারদ্ব সাওমের জন্যে নিয়ত’ হিসেবে নিয়ত করতে হবে। সুবহে সাদিকের পূর্বেই নিয়ত করতে হবে। সকালে উঠে নিয়ত করলে নিশ্চিত রূপেই সহীহ হবে না। কেউ যদি (হায়িয নিফাসের) ব্যাপারে সন্দেহে থেকে সেইদিনের সাওমের নিয়ত করে, তবে সেটা শুদ্ধ হবে না।

৩/ সাওমের সময়। সাওমের সময় শুরু হয় সুবহে সাদিক থেকে, সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় থাকে। সাওম হায়িয নিফাসের সময়, ঈদোৎসবের সময়, ঈদুল আদ্বহার পরের ২ দিন, এবং হজ্জের দিনগুলো (শুধুমাত্র হাজীদের জন্যে) ব্যতীত অন্য যেকোন সময় রাখা যায়।

অন্যান্য বিধিঃ

সূর্যাস্তের সময় দ্রুত ইফতার করা এবং দেরি করে সাহরী খাওয়া মুস্তাহাব বা পছন্দনীয়। নোংরা ও অপছন্দনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা, মাংস চুষার কাঠি দিয়ে মিসওয়াক না করা, নাকে অধিক পানি দেয়া ও অধিক কুলি করা থেকে বিরত থাকাও মুস্তাহাব।

অহাজীদের জন্যে আরাফাতের দিন অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের ৯ ও ১০ তারিখ সিয়াম রাখা মুস্তাহাব। প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ সিয়াম রাখা অর্থাৎ আইয়্যামে বীযের সাওম পালন করা মুস্তাহাব। জুমাবারে সিয়াম রাখা জায়িয। সায়িম (রোযাদার) অবস্থায় কোন কিছুর স্বাদ গ্রহণ করা মাকরূহ, যদি নেয়া হয় তবে থুথু দিয়ে মুখ থেকে ফেলে দিতে হবে। যেসব যৌনাচরণ সহবাসের দিকে ধাবিত করে যেমনঃ চুমো খাওয়া, শারীরিক স্পর্শ, রোমান্টিক চিন্তা করা বা রোমান্স করা মাকরূহ তার জন্যে যে বীর্যপাত বা লিঙ্গোত্থানের ব্যাপারে আত্মসংযমী। যে এরূপ আত্মসংযমী নয়, তার জন্যে এমন করা অবশ্যই হারাম। কেউ যদি নফল সিয়ামও রেখে থাকে, তবুও এসব কাজের দোহাই দিয়ে সিয়াম ভাঙ্গতে পারবে না। কেউ যদি কোন সায়িমের উপর তিন তালাকের জন্যে বা দাসমুক্তির জন্যে চাপাচাপি করে, তাহলে সেটা গ্রাহ্য নয়। তবে তালাকের জন্যে বা দাসমুক্তির জন্যে বলা ব্যক্তিটি সায়িমের মা বাবার কেউ একজন কিংবা তার কোন মাশায়েখ মুর্শিদ হলে তাকে সেটি মেনে নিতে হবে।

কেউ যদি ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত দিনের বেলায় তার সাওম ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তাকে সেটার কাযা করতে হবে। যেহেতু সে একটি গুনাহ করেছে, তাকে অবশ্যই সেটার জন্যে কাফফারা দিতে হবে। এক্ষেত্রে তার তিনটি জিনিসের যেকোন একটি করার স্বাধীনতা রয়েছে। যথাঃ

১/ ৬০ জন মিসকিনের প্রতিজনকে রসূল (সাঃ) এক মুদ্দ পরিমাণ খাবার খাওয়ানো অথবা,

২/ একাধারে দুমাস সাওম পালন করা অথবা,

৩/ একজন মুসলিম দাসীকে বিনা শর্তে পূর্ণ মুক্তি প্রদান করা। এক্ষেত্রে এমন কোন দাসীকে মুক্তি দেয়া যাবে না, যে আগে থেকেই অন্যকোন কারণে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে।

ইতিকাফ কিঃ
ফিক্বহী পরিভাষা অনুযায়ী কোন মুসলিম /মুসলিমাহ যদি আল্লাহর ইবাদাত করার উদ্দেশ্যে সায়িম অবস্থায় (সাওম পালন করা অবস্থায়) মসজিদে এসে সমস্ত প্রকার যৌন চাহিদা থেকে দূরে থেকে পূর্ণ ১ দিন অথবা তার বেশি সময় কাটায়, তবে তাকে ইতিকাফ বলে।
ইতিকাফ কোন পর্যায়ের আমলঃ
ইতিকাফ ফারদ্ব বা ওয়াজিব নয়। একটি দূর্বল পর্যায়ের মানদূব বা প্রশংসনীয় আমল। মানদূবের মধ্যে এটি আবার নফল একটি আমল। নারী পুরুষ উভয়ের জন্যেই।
ইতিকাফের শর্তাবলিঃ
১/ মসজিদে হওয়া, না হলে এমন স্থানে হতে হবে যেখানে কিনা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা হয়ে থাকে।
২/ মহিলাদের ক্ষেত্রে মসজিদে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকতে হবে, এবং এমন একটি প্রকোষ্ঠ থাকতে হবে যেটা পুরুষদের থেকে দূরে হবে।
৩/ ইতিকাফকারী নারী বা পুরুষ খাবার কেনা, অযু করা, গোসল করা কিংবা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্যে ব্যতীত মসজিদ ত্যাগ করতে পারবে না।
৪/ সায়িম (রোজাদার) হতে হবে। গইর সায়িম বা বেরোজাদারের উপর ইতিকাফ প্রযোজ্য নয়।
৫/ কেবলমাত্র ইবাদাত করার নিয়তেই ইতিকাফে বসতে হবে।
৬/ ইতিকাফের সর্বনিম্ন সীমা পূর্ণ ১ দিন। এমনকি ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে ২৩ ঘন্টা অবস্থান করলেও ইতিকাফ আদায় হবে না।
৭/ ইতিকাফকারীর উচিৎ সূর্যাস্তের পূর্বে বা সূর্যাস্তের সময় ইতিকাফের জন্যে মসজিদে আসা। একাধিক দিনের জন্যে ইতিকাফ হলে ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর যেকোন সময় মসজিদ ত্যাগ করতে পারবে।
ইতিকাফ ভেঙ্গে দেয়ঃ
১/ ইচ্ছাকৃত সাওম (রোজা) ভেঙ্গে ফেলা,
২/ রাতে হারাম কিছু খাওয়া বা পান করা,
৩/ যেকোন ধরনের যৌন তৃপ্তি,
৪/ কোন প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ ত্যাগ করা।
*অনিচ্ছাকৃত বা ভুলে সাওম ভাঙ্গলে ইতিকাফ ভাঙ্গবে না। স্বপ্নদোষ হলেও ইতিকাফ ভাঙ্গবে না।
* রমজান মাসের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফ করা মানদূব। ইতিকাফের মানদূব সময় নিম্নে ১০ থেকে উর্ধ্বে ৩০ দিন। ১৫ দিন ইতিকাফে বসাও মানদূব।
* জুমার সালাতের জন্যে এক মসজিদ ত্যাগ করে অন্য মসজিদে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। তাই শুক্রবার পুরুষদের ইতিকাফ এমন মসজিদে করতে হবে, যেখানে জুমার সালাত আদায় করা হয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ।
ইংরেজি রেফারেন্সঃ The guiding helper, main text & explanatory notes, Abu Qanit Al sharif Al hasani Al Iraqi 
মুকাদ্দিমাতুল ইযযিয়্যাহ 

সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

Dhaka

ইফতার: Loading...

সেহরীর শেষ সময়: Loading...