গান বা বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে মালিকি মাযহাব

অন্যান্য মাযহাবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে অনেক কঠোরতা থাকলেও মদিনার মাযহাব অর্থাৎ, মালিকি মাযহাবে বাদ্যযন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই অনুমোদিত।

এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের ইসলামি শারি’আয় পবিত্র কুর’আন এবং সুন্নাহ এর আলোকে গান/ বাদ্যযন্ত্র হারাম বা হালালের সরাসরি কোন উত্তর পাওয়া যায় না।

বিখ্যাত আন্দালুসিয়ান মালিকি কাযি আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদুল্লাহ ইবন আল-‘আরাবি আল-মা’আফিরি আল-ইশবিলি তার আহকাম আল-কুরআন গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
“বলা হয়েছে যে, বিয়ের অনুষ্ঠানে তবলা এবং দাফ্ফ ব্যবহার করা যাবে। একইভাবে সবধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যাবহার করা যাবে তবে গীতসমূহ যেন অশ্লীল না হয়।” [কিতাব আল-আহকাম আল-কুরআন, অধ্যায়-৩, পৃষ্ঠা ১৪৯৪]

আন্দালুসের বিখ্যাত মালিকি কাযি এবং মুহাদ্দিস আবু ‘আবদুল্লাহ আল-কুরতুবি তার আল-জামি লি আহকাম আল-কুরআন এ উল্লেখ করেন:
“রাসুলকে  স্বাগত জানানোর জন্য তার সামনে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়েছিল যখন তিনি এবং আবু বকর (রাঃ) প্রথম মদিনায় হিজরত করেন এবং আবু বকর তখন সবাইকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিতে চাইলে রাসুল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “ও আবু বকর, তাদেরকে তুমি কিছু বলোনা, ইহুদিরা [মদিনার] যেন জানতে পারে যে আমাদের ধর্ম এসকল ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ এবং অমায়িক।” আর এভাবেই মদিনার নারীগণ বাদ্যযন্ত্রের সাথে গান গাইতে থাকে যে, আমরা নাজ্জার এর মেয়েরা! কি চমৎকার ও সুন্দরই না, মুহাম্মাদ কে প্রতিবেশি হিসেবে পেয়েছি আমরা!” [আল-জামি লি আহকাম আল-কুরআন, অধ্যায়-৩, পৃষ্ঠা ৫৪]

বিখ্যাত সালাফি আলেম ও ফকিহ মুহাম্মাদ আল-শাওকানি তার নায়েল আল-আওতার গ্রন্থে বাদ্যযন্ত্র হারামের ব্যাপারে সকল হাদিসের দুর্বলতা দেখিয়ে নিম্নোক্ত বক্তব্য রাখেন:
“যাহরি, মালিকি, হানবালি এবং শাফি’ই এর যেসকল উলামা বাদ্যযন্ত্রকে অনুমোদিত বলেছেন তারা প্রতিটি হাদিসকে (বাদ্যযন্ত্র হারাম বিষয়ক) সমালোচনার মাধ্যমে দুর্বল (যাইফ) বলেছেন।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবুল ফাযল ইবন তাহির বলেন, এইসকল হাদিসের একটি শব্দও সাহিহ নয়।
বাদ্যযন্ত্র অনুমোদনের ব্যাপারে তিনি তার গ্রন্থে আরও বলেন, বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে অনুমতির ব্যাপারে মদিনাবাসীদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য ছিল না এবং যাহিরি আলেমরাও একই মত প্রকাশ করেছেন।
বিখ্যাত মালিকি কাযি ও আলেম ইবন আল আরাবি তার কিতাব আল-আহকাম গ্রন্থে বলেন, বাদ্যযন্ত্র হারামের একটি সাহিহ হাদিসও নেই।
বিখ্যাত আলেম ইবন হাযম বলেন, প্রতিটি হাদিস যা গান-বাজনা হারাম বলেছে তা রাসুল ﷺ পর্যন্ত পৌঁছে না, তা শুধুমাত্র রাসুল ﷺ ব্যাতিত অন্য কারো পর্যন্ত পৌঁছে।
বিখ্যাত আলেম ইমাম আল হারামাইন বর্ণনা করেন, বিখ্যাত সাহাবি আব্দুলাহ বিন যুবাইর (রাঃ) অনেক নারী সঙ্গীতশিল্পী ও নৃত্যশিল্পী দাসীর অধিকারী ছিলেন এবং তারা তার জন্য সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করতেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফারাজ আল-ইস্ফাহানি বর্ণনা করেন, রাসুল ﷺ এর বিখ্যাত সাহাবি এবং কবি হাসান বিন সাবিত সঙ্গীত উপভোগ করতেন।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আল আবু বকর আল-আদফাওই পঞ্চম খুলাফায়ে রাশেদিন ‘উমার বিন আব্দুল ’আযিয থেকে বর্ণনা করেন যে, খালিফ হওয়ার পূর্বে তিনি সঙ্গীত শুনতেন।
আল-আদফাওই আরও বলেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য ছিল না যে মদিনার কাযি ইবরহিম ইবন সা’দ সঙ্গীত শুনতেন এবং তা অনুমোদনযোগ্য বলতেন।
বিখ্যাত শাফি’ই আলেম ইবন মাহাসিন আল-রুইয়ানি, কাফআল থেকে বর্ণনা করেন, মালিকি মাযহাব অনুযায়ী সুর, বাদ্যযন্ত্র এবং সঙ্গীত অনুমোদিত, আবু মানসুর ফাওরানি এই বক্তব্য মালিকি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক থেকেও বর্ণনা করেছেন।
বিখ্যাত শাফি’ই আলেম আবু তালিব আল-মাক্কি তার গ্রন্থ কুতুল কুলুব এ বর্ণনা করেন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস মানহাল ইবন আমর তার প্রাসাদে বাদ্যযন্ত্র উপভোগ করতেন।” [নায়েল আল-আওতার, অধ্যায়-৮, পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫]

দেখা যাক আবু মুহাম্মাদ ইবন হাযাম তার আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে কি বলেছেন:
“রাসুল বলেন: প্রতিটি কাজের বিচার সে কাজের নিয়ত অনুযায়ী হবে। তাই, কেউ যদি আল্লাহকে অমান্য করার উদ্দেশ্যে গান-বাজনা শুনে থাকে তবে সে একজন গুনাহগার হিসেবেই বিবেচিত হবে। সঙ্গীত ছাড়াও এটি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর ইবাদতে উদ্যমী ও মনযোগী হওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেকে শান্ত করার জন্য সঙ্গীত শুনে তবে একজন ভালো এবং বাধ্য বান্দা হিসেবে তার জন্য তা অনুমোদিত হবে। কিন্তু কেউ যদি ভালো খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই সঙ্গীত শুনে থাকে তবে তা লাঘ্বও (অযথা কাজ) হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা ক্ষমা ও উপেক্ষা করা হবে [আল্লাহ্‌ কর্তৃক]। এটি পার্কে হাঁটার মতো কাজ হিসেবেই [তানাযযুহ] বিবেচ্য হবে।” [আল-মুহাল্লা, অধ্যায়-৯, পৃষ্ঠা ৬০]

সকল বিষয়ের প্রেক্ষিতে আমাদের সিদি মুহাম্মাদ ইকবাল বলেন:
“আমাদের মাযহাবের মাশহুর মত হচ্ছে, বিভিন্নি ক্ষেত্রে গান-বাজনা অনুমোদিত যেমন, সুন্নতে-খাতনা, বিয়ে, মেহমানদের স্বাগত জানাতে, ঈদ ইত্যাদি। তাই এইসকল আনুষ্ঠানিক উপলক্ষ ছাড়া এটি অপছন্দনীয়। কিন্তু, অনেক মালিকি উলামাই গান-বাজনা সম্পূর্ণরূপে হালাল বলেছেন যেমন, কাযি আবু বকর ইবন আল-আরাবি এবং প্রমুখ। আমি ব্যাক্তিগতভাবে, এই ব্যাপারে ইমাম জুনাইদ আল-বাগদাদি এর মত পছন্দ করি। যা হচ্ছে, সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিক লোকজনের সাথে। আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।”

সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

Dhaka

ইফতার: Loading...

সেহরীর শেষ সময়: Loading...