সূচনাঃ
আমাদের এই ইমাম হচ্ছেন একজন বিশাল, অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইনি মহান ইমামদের মধ্যে একজন। তাঁর নাম হলো, মালিক ইবনে আনাস (রঃ)। ইমাম মালিক ইবনে আনাস তাঁর সমস্ত জীবন মদীনা মুনাওয়ারায় কাটিয়েছেন। হজ্জের সময় মক্কায় যাওয়া ব্যতীত তিনি কখনোই মদীনা ত্যাগ করেন নি! তিনি মদীনা মুনাওয়ারায়ই জন্মেছেন, জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি এই শহরকে ভালোবেসেছেন, তিনি এই শহরকে এতোটাই সম্মান করেছেন যে, তিনি এই শহরে কখনও কোন সওয়ারীতে যেমনঃ গাধা, ঘোড়া কিংবা খচ্চরে চড়েন নি। কারণ, তিনি ভাবতেন যে, যেই মাটি রসূল (সাঃ) এঁর দেহ মুবারক নিজের মধ্যে ধারণ করে আছে, সেই মাটির উপর তিনি কোন সওয়ারীতে চড়তে পারেন না! তিনি এই শহরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। ভালোবেসেছেন এই মসজিদে নববীকে এবং রসূল (সাঃ)কে। সেটা তাঁর আচরণে ও তাঁর ফিক্বহী মাযহাবে প্রকাশ পেয়েছে। আপনি সর্বত্রই এটা দেখবেন।
জন্মঃ
ইমাম মালিক (রঃ) ৯৩ হিজরী সালে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। ফিক্বহী মাযহাবের সকল মহান ইমাম ৫০-৬০ বছরের ব্যবধানে জন্মেছেন। ইমাম আবু হানিফা জন্মেছেন ৮০ হিজরীতে, ইমাম আওযায়ী ৮৭ হিজরীতে এবং ইমাম লাইস ইবনু সাদ ৯৪ হিজরীতে। এই ফিক্বহী ইমামদের দ্বিতীয় দলটি এসেছে সামান্য সময় পরে। যেমনঃ ইমাম শাফিঈ জন্মেছেন ১৫০ হিজরী সনে আর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল জন্মেছেন ১৬৪ হিজরী সালে।
ইমাম মালিকের পরিবারঃ
ইমাম মালিকের পরিবার ছিল জ্ঞানী ও সত্যনিষ্ঠ। তাঁরা ছিলেন খুবই ইলমদার। তাঁর দাদার বাবা আবু আমির (রাঃ) ছিলেন একজন সাহাবী। তাঁর দাদা ছিলেন একজন মহান তাবিয়ী এবং তাঁর নামও ছিল মালিক। তাঁর সঙ্গে খলীফা উসমান (রাঃ) এঁর সুসম্পর্ক ছিল এবং তিনি ছিলেন ঐসব কুরআনের কপি লেখক, যেগুলো উসমান (রাঃ) এঁর আদেশে ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলোয় বন্টন করা হয়। তিনি সেই চারজনেরও একজন যারা উসমান (রাঃ) এঁর খাটিয়া বহন করে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে নিয়ে আসেন। তিনি উমার ইবনে আব্দুল আযীযের যুগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। অর্থাৎ যখন তিনি মারা যান, আমাদের ইমাম মালিকের বয়স ৭ কি ৮। ইমাম মালিকের বাবা তীর তৈরি করতেন। তাঁর মা ছিলেন একজন বিদূষী মহিলা। ইমাম মালিকের মন ইসলামী ইলমের দিকে ঘুরাতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেক। ইমাম মালিকের আরো ভাই ছিলো। তাঁর ভাই নযর ইবনে আনাস ইলম শিক্ষায় তাঁর চেয়ে কয়েক বছর এগিয়ে ছিলেন। লোকে ইমাম মালিকের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁকে ‘নযরের ভাই মালিক’ নামে সম্বোধন করত। পরে যখন ইমাম মালিক ইলমের জগতে জনপ্রিয় হয়ে গেলেন তখন লোকে নযরকে চিনতে গিয়ে বলত ‘মালিকের ভাই নযর’।
বাল্যকালঃ
ইমাম মালিক বাল্যকালে অন্যান্য বাচ্চাদের মতই ছিলেন। তাঁর অনেক বিষয়েই আগ্রহ ছিল। যার কোনটিই ‘ফিক্বহ’ ছিল না। কোন একসময়ের ঘটনা এরকম যে, একবার ইমাম মালিক পরিবারের সাথে খেতে বসেছেন। তাঁর বাবা আনাস তাঁকে একটি প্রশ্ন করলেন। ইমাম মালিক উত্তর দিতে না পেরে পরিবারের কাছে লজ্জিত হলেন এবং রাগাম্বিত হলেন। তাঁর মা তাঁর এই রাগকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যেটা তাঁর জন্যে কল্যাণকর হয়। যখন তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না, তখন তাঁর মা তাঁকে নিয়ে গোসল করালেন, উত্তম দামী কাপড় পড়ালেন, একটি বড় পাগড়ি পড়িয়ে তাঁকে সুগন্ধি মাখালেন। তারপর তিনি তাঁর হাতে কাগজ দিয়ে মসজিদে নববীতে দিয়ে আসলেন। সেইসময় মদীনার মসজিদে একই সময়ে ৭০ টা ভিন্ন ভিন্ন ক্লাস হচ্ছিল। সেই মসজিদ ছিল ইলমে কানায় কানায় ভরপুর। মদীনায় শত শত তাবিয়ী উলামা ছিলেন যাদের জ্ঞানকে আজকের যেকোন বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করা যায়। মালিকের মা জানতেন যে, তাঁকে কার দরসে নিয়ে বসাতে হবে এবং তিনি তাঁকে রবীয়া ইবনে আব্দুর রহমানের ক্লাসে বসিয়ে দিলেন। রবীয়া এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি কিনা মদীনার বিখ্যাত ৭ জন ফুক্বাহার নিকট ইলম শিখেছেন যারা কিনা ছিলেন সাহাবীদের (রাঃ) সরাসরি ছাত্র। বিশেষ করে চার জন ‘আব্দুল্লাহর’ ছাত্র ছিলেন। এই চারজন হলেনঃ আব্দুল্লাহ ইবনে উমার, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)। মালিকের মা তাঁকে রবীয়ার কাছে পাঠিয়ে বললেন যে, তাঁর ইলম শেখার আগে তাঁর কাছ থেকে তাঁর আদব শেখো।
এরকম আরো একটি ঘটনা আছে যে, ইমাম মালিকের গান গাওয়ার ও গাইতে শেখার প্রতি আগ্রহ ছিলো। সেই সময়ে মদীনা এবং হিজাযে গান গাওয়া ঋদ্ধ ছিলো। তাঁর মা এই ইচ্ছার কথা শুনে তাঁকে তিরস্কার করলেন না, বরং তিনি তাঁকে উপদেশ দিলেন যে, গান গাওয়া হচ্ছে এমন একটি জিনিস; যা কিনা চেহারার সৌন্দর্যের সাথে সম্পর্ক রাখে। চেহারার সৌন্দর্য শেষ তো গায়কের খ্যাতিও শেষ। সেই উপদেশই ইমাম মালিককে ইলম অর্জনে সম্মত করে যখন তিনি কেবলই একজন বালক ছিলেন।
ইমাম মালিক তাঁর বাল্যকালে দুষ্টু ছিলেন এবং তিনি তাঁর শাইখদেরকে একা পাওয়ার জন্যে কিছু দুষ্টুমি পদ্ধতির আশ্রয় নিতেন। তিনি অন্য সহপাঠীদের হাতে খেজুর দিয়ে তাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্যদিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে শাইখের ক্লাসে বসে যেতেন। কখনো সখনো তিনি তাঁর বৃদ্ধ ও অন্ধ শাইখদের মসজিদ থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। তাঁর বোন তাঁর ব্যাপারে খুব চিন্তিত থাকতেন। কারণ তিনি শাইখদের জন্যে অপেক্ষা করতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আনাস বলেনঃ “ তাঁকে নিয়ে তুমি ভেবো না। কারণ আমার ছেলে রসূল (সাঃ) এঁর হাদীস শিখতে যায়।”
তাঁর উস্তাদগণঃ
মালিক (রঃ) তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথম ৭ বছর শুধু একজন শাইখের কাছেই ইলম শিখেছেন। তিনি হলেন রবীয়া (রঃ)। তিনি ছিলেন ক্ষুরধার মস্তিষ্কের অধিকারী, একজন জ্ঞানী শাইখ। রবীয়া (রঃ) ছাড়া তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে হরমুযের নিকট ৮ বছর ইলম শেখেন। ইবনে হরমুয ছিলেন একজন মাওয়ালী (মুক্ত দাস)। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, প্রত্যেক সাহাবীরই এমন দাস ছিলেন যারা কিনা পরবর্তী জীবনে ইলমের জগতে পণ্ডিত হয়েছেন। তখনকার দিনে মনিব ও মাওয়ালীদের মধ্যে এরূপই সম্পর্ক ছিল। যেসব বড় বড় সাহাবী ইলম চর্চায় জীবন ব্যয় করেছেন, তাঁদের মাওয়ালীগণ যেমনঃ আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) যিনি রসূল (সাঃ) এঁর খিদমতে ১০ বছর কাটিয়েছেন, তাঁর মাওয়ালী ইবনে সিরীন (রঃ) পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে জ্ঞানের এক বড় উৎস হয়ে রয়েছেন। ইবনে হরমুয ছিলেন আবু হুরাইরা (রাঃ) এঁর মাওয়ালী বা মুক্তদাস। তাঁর সঙ্গে ইমাম মালিকের (রঃ) সখ্যতা আরো ৩০ বছর টিকেছিল। ইমাম মালিক যখনই বলতেন যে, আমি রসূল (সাঃ) এঁর শহরের লোকদের থেকে বিষয়টি এভাবে শিখেছি, তিনি এই দুজনের কথাই অর্থাৎ রবীয়া ও ইবনে হরমুযের কথাই বুঝাতেন।
ইমাম মালিকের ৩য় শিক্ষক ছিলেন নাফি (রঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) এঁর মাওলা। হাদীসের জগতে ‘শাফিয়ী মালিক থেকে, মালিক নাফি থেকে, নাফি আব্দুল্লাহ ইবনি উমার থেকে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রসূল (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন’ ; এই সনদ বা হাদীস বর্ণনার ধারাকে হাদীসের রিওয়াতের ‘স্বর্ণলতিকা’ বা ‘গোল্ডেন চেইন’ বলা হয়। এই হাদীসগুলো সনদের দিক থেকে সবচাইতে শক্তিশালী।ইমাম মালিকের ৪র্থ শিক্ষক ছিলেন ইবনে শিহাব যুহরী (রঃ)। তিনি উমার ইবনে আব্দুল আযীযের সঙ্গী ছিলেন এবং তিনি রসূল (সাঃ) এঁর হাদীস সমূহকে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করেছেন। তিনি ইমাম আবু হানিফারও আগে ফিক্বহ শাস্ত্রকে বিন্যস্ত করেছেন। মালিকের ৫ম শিক্ষক ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক (রঃ)। তিনি ইমাম আবু হানিফারও শিক্ষক। ইমাম মালিকের মুয়াত্তায় তাঁর থেকে বর্ণিত ৯টি হাদীস স্থান পেয়েছে। তিনি বাবার দিক থেকে আলী (রাঃ) ও মায়ের দিক থেকে আবু বকর (রাঃ) এঁর বংশধর ছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, ইমাম মালিকের শিক্ষক সংখ্যা ৯০০ এর উপরে।
ইমাম মালিকের অবয়ব ও ব্যক্তিত্বঃ
ইমাম মালিক ছিলেন লম্বা, সুন্দর, সুঠামদেহী একজন মানুষ। তাঁর সোনালী চুল ছিলো। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাঁর চোখের মণি ছিল নীল রঙের। তাঁর পূর্বপুরুষ ইয়ামেনী ছিলেন। তাঁর বুক ছিল চওড়া। তিনি নিজের জন্যে নয় বরং রসূল (সাঃ) এঁর হাদীসের বর্ণনা রক্ষার্থে ইয়ামেন ও খুরাসান থেকে আসা দামী কাপড় পরতেন। তাঁর হাতে কালো পাথর বসানো রূপার তৈরি আংটি শোভা পেত। সেখানে লেখা ছিল (حسبي اللہ ونعم الوكيل)। তিনি রসূল (সাঃ) হাদীস সবসময় অযু করে, দামী কাপড় করে, সুগন্ধি লাগিয়ে বসে বয়ান করতেন। দাঁড়িয়ে কখনো হাদীস বর্ণনা করতেন না। তাঁর বসার স্থানটি ছিল একটি সিংহাসনের ন্যায়। রসূল (সাঃ) যেখানে বসতেন, তিনিও সেখানে বসেই হাদীস বয়ান করতেন। তিনি সুষম খাবার খেতেন এবং কলা খেতে পছন্দ করতেন । তিনি কলাকে জান্নাতী ফল ভাবতেন। কারণ এটি পরিষ্কার ও বারমাসি ফল। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এঁর বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করতেন এবং প্রতি শুক্রবারে লোকদের দাওয়াত করে খাওয়াতেন। তাঁর বাড়িটি ছিল খুবই পরিষ্কার এবং ছিমছাম আসবাবপত্র রাখা। তাঁর বাড়ির দরজায় লেখা ছিল (ماشاء اللہ)।
হজ্জের মৌসুমে ইরাক, শাম, মরক্কো, স্পেন থেকে দলে দলে লোকেরা তাঁর কাছে শিখতে আসতো। এটি তাঁর মাযহাব মদীনার বাইরে ছড়ানোর কারণগুলোর মধ্যে একটি। তাঁর পিতামাতা মারা যাওয়ার পর তিনি অর্থকষ্টে পড়েন এবং শিক্ষার খরচ যোগাতে তাঁর ঘরের ছাদের কাঠ বিক্রি করতে হয়েছিল। আবু হানিফা (রঃ) এঁর মতো তাঁরও প্রথমে কাপড়ের ব্যবসা ছিলো। পরবর্তীতে স্বচ্ছলতা আসলে তিনি শুধু খলীফার উপহারই গ্রহণ করতেন। তিনি সেটা নিজে ব্যবহার না করে লোকদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। এটা তিনি করতেন যেন খলীফাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে সময়ে সময়ে তাদের উপদেশ দিতে পারেন। বাস্তবেও তাইই ঘটেছে। খলীফা মানসুর একবার মদীনার গভর্নরকে লিখে পাঠানঃ “কোন আদেশ তখনই জারি করবে যদি ইমাম মালিক সেটার পক্ষে রায় দেন। নচেৎ আদেশ বাতিল করবে।”
ইমাম মালিক ছিলেন বিবাহিত এবং তাঁর তিনজন পুত্র ও একজন কন্যা ছিল। তাঁর মেয়ে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বড় একজন মুহাদ্দিসায় পরিণত হন। তিনি ইমাম মালিকের সংকলিত ‘আল মুয়াত্তা’ মুখস্থ করেছিলেন। মুয়াত্তায় ১৭২০ টি হাদীস রয়েছে। মুয়াত্তার অনেক কপি রয়েছে। ইমাম আবু হানিফার ছাত্র মুহাম্মাদ আশ শাইবানী (রঃ)ও মুয়াত্তা রিওয়াত করেছেন। অন্য একজন যিনি মুয়াত্তা রিওয়াত করেছেন তিনি হলেন আসয়াদ ইবনে ফুরাত। সিসিলি, মরক্কো ও স্পেনে মালিকী মাযহাব প্রচারের কৃতিত্ব তাঁর।
ইমাম মালিক সম্পর্কে অন্যান্য ইমামগণঃ
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হলঃ “ মদীনার নবীন ছেলেদের আপনি কেমন দেখলেন ?” তিনি বললেনঃ “ তাদের মধ্যে যদি কেউ উন্নতি লাভ করে সে হবে মালিক।”ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হলঃ “ আপনি যদি কারো হাদীস মুখস্ত করার ইচ্ছে রাখেন, তবে কার হাদীস মুখস্থ করবেন ?” তিনি বললেনঃ “মালিক ইবনে আনাসের হাদীস মুখস্থ করবো।”ইবনে মুইন বলেনঃ “ ইমাম মালিক আল্লাহর তরফ থেকে সৃষ্টিজগতের জন্যে একটি প্রমাণ স্বরূপ।” ইমাম যাহাবী ইমাম মালিককে ফক্বীহুল উম্মাহ বলেছেন।ইমাম শাফিয়ী বলেনঃ “ যদি ইমাম মালিক ও সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা না হতেন, তবে হিজায থেকে ইলম শেষ হয়ে যেতো।”
ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাবঃ
ইমাম মালিক (রঃ) এঁর নামে তাঁর মাযহাবের নাম হয়েছে মালিকী মাযহাব। কারণ, এই মাযহাব কুরআন, সুন্নাহের উপর তাঁর গবেষণা, ফতোয়া এবং অপরাপর মালিকী আলিমদের গবেষণার উপর প্রতিষ্ঠিত।
ইমাম মালিক (রঃ) নিজে তাঁর মাযহাবের উসূল বা মূলনীতির কথা উল্লেখ করেননি। যদিও তাঁর ফতোয়ায় ও রচনাবলিতে তাঁর মাযহাবের উসূল কি কি, সেটা সম্পর্কে ইঙ্গিত মেলে। তাঁর ছাত্ররা এবং পরবর্তী মালিকী আলিমগণ তাঁর মাযহাবের মূলনীতি লিপিবদ্ধ করেছেন।
মালিকী মাযহাবের মূলনীতিগুলো হলঃ
১/ কুরআন, ২/ সুন্নাহ, ৩/ সাহাবীদের ফতোয়া, ৪/ ইজমা, ৫/ মদীনাবাসীদের আমল, ৬/ কিয়াস, ৭/ ইস্তিসান বা সুবিধে বিবেচনা, ৮/ ইস্তিসাব বা একটি জিনিস পূর্বে যেমন বিচার করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও করা হবে, যতক্ষণ না সেটার পরিবর্তন সকলের নিকট প্রমাণিত হয়। ৯/ আল মাসালিহ আল মুরসালা বা জনগণের আগ্রহ বিবেচনা করা, ১০/ আদ্ব দ্বারাঈ বা হারামের উপায়ও অবরুদ্ধ করা, ১১/ উরফ বা প্রথা।
মালিকী মাযহাবের বিশেষত্ব হল, এটা মদীনাবাসীদের মাযহাব। মদীনাবাসীদের আমল এতে সংকলিত হয়েছে। একে মাযহাবু আহলুল হাদীসও বলা হয়, কারণ মদীনাতেই সর্বাধিক সাহাবী ছিলেন। তাই এখানে সবচেয়ে বেশি হাদীসের দেখা মেলে। তাই দেখা যায়, মালিকী মাযহাবে সবদিকের মতই মেলে। যেমনঃ তারাবীহের ক্ষেত্রে মালিকী মাযহাবে ৮ রাকাত থেকে শুরু করে ৩৬ রাকাতের রিওয়াতও পাওয়া যায়। তবে মশহূর মত, ২০ রাকাত। আবার মালিকী মাযহাবে মদীনাবাসীর আমলকে অল্পসংখ্যক সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসের তুলনায় অগ্রগামী ধরা হয়, যদিও বা হাদীস সহীহ হয়। যেমনঃ সাদল করা বা সালাতে হাত না বেঁধে ঝুলিয়ে রাখার কোন হাদীস কিন্তু সহীহাইনে নেই। কিন্তু এটা ইমাম মালিকের সময়ের হাজারো মদীনাবাসীর আমল দ্বারা প্রমাণিত, অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে তাবিয়ীদের আমলরূপে এসেছে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) এর আমল হিসেবেও এসেছে। তার বিপরীতে হাত বাঁধার হাদীস সম্ভবত ১৮ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। তাই ইমাম মালিকের নিকট কয়েক হাজার মদীনাবাসীর আমল শক্তিশালী যেহেতু সেটা সাহাবাদের যুগ থেকেই মদীনায় প্রচলিত। আবার হাত বাঁধার হাদীস থাকার দরুণ নফল সালাতে সেটারও অনুমতি আছে।
বর্তমানে মালিকী মাযহাব কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত সহ প্রায় সমগ্র আফ্রিকা, এবং ইউরোপ আমেরিকাতেও প্রচলিত। ২০-২৫% মুসলিম এই মাযহাব অনুসরণ করেন। সৌদি আরব রাষ্ট্র কায়িমের পূর্বে মক্কা মদীনায় মালিকী মাযহাব অনুসরণ করা হতো।
ইমাম মালিকের ইন্তেকালঃ
শেষ জীবনে তিনি বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং পিটিয়ে তাঁর হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়। তিনি জাবরী তালাকের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর ফতোয়া ছিল যে, জোরজবরদস্তি করে তালাক দেয়া হলে তালাক হবে না। কিন্তু হানাফী মাযহাবের রায় হলো, তাতেও তালাক হয়ে যাবে। তিনি যখন তাঁর ফতোয়া মদীনায় প্রচার করতেন, সেটা আব্বাসীয়দের রাষ্ট্রীয় মাযহাব হানাফীয়্যাতের বিপরীতে চলে যায়। মদীনার আব্বাসী গভর্নর একে আব্বাসী সাম্রাজ্যের জন্যে হুমকিস্বরূপ মনে করছিলেন। তিনি ইমাম মালিককে এই ফতোয়া প্রচারে নিষেধ করলেও ইমাম মালিক নিজের অবস্থানে অটল থেকে ফতোয়া প্রচার করতে থাকেন। তখন তাঁকে বেদম পেটানো হয় এবং তাঁর কাঁধের হাড়ও স্ব জায়গা থেকে সরে যায়। তখন তিনি আর মসজিদে যেতেন না। তিনি ১৭৯ হিজরীর ১৪ই রবিউল আউয়াল ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মদীনার আমির তাঁর জানাযা সালাত পড়ান। তাঁকে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুসংবাদ বাগদাদে মুহাম্মাদ আশ শাইবানীর নিকট পৌঁছাতেই তিনি বলে উঠেনঃ “ কত বড় মুসিবত এসে পড়েছে! মালিক ইন্তেকাল করেছেন, হাদীস শাস্ত্রের সম্রাট ইন্তেকাল করেছেন!”
তথ্যসূত্রঃ
- ডঃ হিশাম হাওয়াসলির লেকচার
- চার ইমামের জীবনী, মাওলানা মতিউর রহমান
- Fundamental principles of Maliki fiqh